পাইলস এর লক্ষণ কি এবং ঘরোয়া উপায়ে নিরাময়ের উপায় কি? কারণ, বিপদচিহ্ন ও বাংলাদেশের বাস্তবতায় আধুনিক চিকিৎসা
পাইলস বা অর্শ রোগ নিয়ে লজ্জা ও অবহেলা ডেকে আনে চরম বিপদ। প্রাথমিক অবস্থায় ঘরোয়া উপায়ে পাইলস নিয়ন্ত্রণ করার বৈজ্ঞানিক উপায়, বিভিন্ন ধাপের লক্ষণ এবং হাতুড়ে এসিড চিকিৎসার ভয়ংকর ক্ষতি নিয়ে এক পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণী গাইড।

মানবদেহের সবচেয়ে সংবেদনশীল কিন্তু একই সাথে সবচেয়ে উপেক্ষিত অঙ্গগুলোর একটি হলো মলদ্বার। আমাদের সমাজে মাথার যন্ত্রণা বা হার্টের অসুখ নিয়ে মানুষ যেভাবে অবলীলায় আলোচনা করে, মলদ্বারের রোগ নিয়ে সেভাবে কথা বলতে চরম সামাজিক লজ্জা, সংকোচ ও হীনম্মন্যতায় ভোগে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই সংকোচ বহু গুণ বেশি। রোগ লুকিয়ে রাখার এই মানসিকতার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে ভয়ংকর সব হাতুড়ে কবিরাজি ও ভুয়া "এসিড দিয়ে পাইলস পোড়ানো"র দালাল সিন্ডিকেট।
মলদ্বারে কোনো অস্বস্তি বা রক্তপাত হলেই অধিকাংশ মানুষ ধরে নেন তাঁদের ‘পাইলস’ হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় পাইলস বা অর্শ রোগ ছাড়াও ফিশার, ফিস্টুলা কিংবা এমনকি মলাশয়ের ক্যানসারের মতো রোগেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
তবে আশার কথা হলো—পাইলস কোনো অভিশাপ বা দুরারোগ্য ব্যাধি নয়। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে এবং জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন আনলে কোনো ধরনের অপারেশন ছাড়াই কেবল ঘরোয়া পরিচর্যা ও খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পাইলস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এই আর্টিকেলে আমরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে জানব—পাইলস এর লক্ষণ কি এবং ঘরোয়া উপায়ে নিরাময়ের উপায় কি, এটি কেন হয়, পাইলসের বিভিন্ন ধাপ এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভুল চিকিৎসার হাত থেকে বাঁচার উপায়।
পাইলস বা হেমোরয়েডস আসলে কী? এর শারীরবৃত্তীয় কারণ
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় পাইলসকে বলা হয় হেমোরয়েডস (Hemorrhoids)। শারীরবৃত্তীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মলদ্বারের ভেতরের দেয়ালে রক্তনালীর কিছু প্রাকৃতিক কুশন বা মাংসল ভাঁজ থাকে, যা মল ধরে রাখতে এবং গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

পাইলস প্রধানত দুই প্রকার:
অভ্যন্তরীণ পাইলস (Internal Hemorrhoids): এটি মলদ্বারের ভেতরের অংশে (পেক্টিনেট লাইনের ওপরে) তৈরি হয়। যেহেতু এখানকার নার্ভগুলো ব্যথাসংবেদনশীল নয়, তাই এতে সাধারণত কোনো ব্যথা থাকে না; তবে মলত্যাগের সময় টপ টপ করে তাজা লাল রক্ত পড়ে।
বহিঃস্থ পাইলস (External Hemorrhoids): এটি মলদ্বারের ঠিক বাইরের চামড়ার নিচে সৃষ্টি হয়। এই অংশে প্রচুর ব্যথাবাহী স্নায়ু থাকায় এতে প্রচণ্ড ব্যথা, জ্বালাপোড়া এবং চুলকানি অনুভূত হয়। রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধলে একে ‘থ্রম্বোজড হেমোরয়েড’ বলা হয়, যা রোগীর বসা বা হাঁটাচলা অসম্ভব করে তোলে।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় পাইলসের প্রকোপ: খাদ্যাভ্যাস ও সামাজিক ট্র্যাজেডি
আমাদের দেশে পাইলস রোগের বিস্তার দিনে দিনে মহামারীর মতো বাড়ছে। এর পেছনে মূলত আমাদের ত্রুটিপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস, অলস জীবনযাপন এবং চিকিৎসার অজ্ঞতা দায়ী:

বাঙালি সংস্কৃতির উৎসব, মেহমানদারি কিংবা দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় গরু ও খাসির মাংসের আধিক্য অত্যন্ত বেশি। বিশেষ করে কোরবানির ঈদের পর ঘরে ঘরে কোষ্ঠকাঠিন্য ও পাইলসের আক্রমণ মারাত্মক রূপ নেয়। বিপরীতে শাকসবজি, সালাদ, লাল চাল ও পর্যাপ্ত ফাইবার খাওয়ার অভ্যাস নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ফাইবার না থাকলে মল শক্ত ও শুষ্ক হয়ে পড়ে, যা রক্তনালী ছিঁড়ে ফেলার মূল কারণ।
২. টয়লেটে স্মার্টফোনের অপব্যবহার ও ভুল বসার ভঙ্গি
বর্তমান শহুরে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় রোগ হলো টয়লেটে কমোডে বসে দীর্ঘক্ষণ মোবাইল স্ক্রোল করা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত—টয়লেটের কমোডে ১০ মিনিটের বেশি বসে থাকলে মাধ্যাকর্ষণের টানে মলদ্বারের রক্তনালীর ওপর অস্বাভাবিক চাপ পড়ে। এছাড়া পাশ্চাত্য পদ্ধতির উঁচু কমোডে বসার কারণে রেকটামের কোণ (Anorectal Angle) সোজা হতে পারে না, যার ফলে মলত্যাগে অতিরিক্ত ‘কোঁথ’ দিতে হয়।
৩. "এসিড দিয়ে পাইলস পোড়ানো"র নির্মম পরিণতি
বাংলাদেশে পাইলস রোগীদের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো ফুটপাতের লিফলেট ও ইউটিউবের ভুয়া কবিরাজদের খপ্পরে পড়া। এসব হাতুড়েরা দ্রুত নিরাময়ের নামে কোনো অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়া মলদ্বারে বিষাক্ত নাইট্রিক বা সালফিউরিক এসিডের পেস্ট লাগিয়ে দেয়। এতে রক্তনালীর পাশাপাশি মলদ্বারের সুস্থ স্ফিংক্টার পেশি (যা মল ধরে রাখে) সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। পরবর্তীতে মলদ্বারের ছিদ্র সরু হয়ে বন্ধ হয়ে যায় (Anal Stenosis) কিংবা রোগী সারা জীবনের মতো মল ধরে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন (Fecal Incontinence)।
পাইলস এর লক্ষণ কি? (বিভিন্ন ধাপের বিশদ উপসর্গ)
পাইলসের লক্ষণগুলো এর তীব্রতা ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। অভ্যন্তরীণ পাইলসকে তার তীব্রতা অনুযায়ী ৪টি ধাপে ভাগ করা হয়:

প্রথম ধাপ (Grade I): মলদ্বারের ভেতরে রক্তনালী ফুলে থাকে কিন্তু বাইরে বেরিয়ে আসে না। মলত্যাগের সময় মলের সাথে বা মলত্যাগের শেষে সম্পূর্ণ ব্যথাহীন তাজা টকটকে লাল রক্ত ফোঁটায় ফোঁটায় পড়তে দেখা যায়।
দ্বিতীয় ধাপ (Grade II): মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপের কারণে মাংসপিণ্ড বা বলি বাইরে বের হয়ে আসে, কিন্তু মলত্যাগ শেষ হলে এটি নিজ থেকেই ভেতরে চলে যায়।
তৃতীয় ধাপ (Grade III): মলত্যাগের সময় মাংসপিণ্ড বাইরে বেরিয়ে আসে এবং এটি নিজে নিজে ভেতরে যায় না; আঙুল দিয়ে চাপ দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে হয়।
চতুর্থ ধাপ (Grade IV): এই পর্যায়ে রক্তনালী ও মাংসপিণ্ড স্থায়ীভাবে বাইরে ঝুলে থাকে। আঙুল দিয়ে চেষ্টা করলেও তা আর ভেতরে ঢোকানো যায় না। এতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে পচন (Strangulation / Gangrene) ধরার চরম ঝুঁকি থাকে।
পাইলসের সাধারণ সার্বিক লক্ষণসমূহ:
বেদাহীন তাজা রক্তপাত: পাইলসের প্রধান লক্ষণ হলো মলত্যাগের সময় রক্ত পড়া। এই রক্ত সবসময় উজ্জ্বল লাল রঙের হয় এবং মলের সাথে মিশে থাকে না, বরং প্যানের পানিতে ছিটকে পড়ে।
মলদ্বারে মাংসপিণ্ড বা বলি অনুভূত হওয়া: মলত্যাগের পর পরিষ্কার করার সময় হাতে শক্ত বা নরম গোটার মতো মাংসের দলা লাগা।
তীব্র চুলকানি ও অস্বস্তি (Pruritus Ani): ভেতর থেকে মিউকাস বা আঠালো তরল নিঃসরণ হওয়ার কারণে মলদ্বারের আশপাশের ত্বক ভিজে থাকে এবং তীব্র চুলকানি হয়।
মল পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়ার অনুভূতি: মনে হয় মলদ্বারে কিছু একটা আটকে আছে এবং বারবার টয়লেটে যাওয়ার বেগ হয় (Tenesmus)।
চরম রক্তশূন্যতা ও দুর্বলতা (Chronic Anemia): রোগীরা অনেক সময় ব্যথাহীন রক্তপাতকে গুরুত্ব দেন না। প্রতিদিন কয়েক ফোঁটা রক্ত যেতে যেতে একপর্যায়ে রক্তে হিমোগ্লোবিন মারাত্মকভাবে কমে যায়।
দীর্ঘমেয়াদী রক্তক্ষরণে রোগীর শরীরে হিমোগ্লোবিন ও রক্তের অক্সিজেন বহন ক্ষমতা ভেঙে পড়লে কী সংকট তৈরি হয়, তা জানতে পড়ুন — হঠাৎ অক্সিজেন কমে গেলে কী করবেন? লক্ষণ ও জরুরি প্রতিকার
পাইলস বনাম ফিশার, ফিস্টুলা ও ক্যানসার: পার্থক্য চেনার উপায়
মলদ্বারে সমস্যা হলেই সবাই তাকে পাইলস মনে করেন। কিন্তু লক্ষণ দেখে পার্থক্য বোঝা জরুরি:
| রোগ | প্রধান লক্ষণ | ব্যথার তীব্রতা | রক্তের ধরণ |
| পাইলস (Piles) | মলদ্বারে ফোলা বলি ও মাংস ঝুলে পড়া। | প্রাথমিক ধাপে কোনো ব্যথা থাকে না। | মলের শেষে ফোঁটায় ফোঁটায় তাজা লাল রক্ত পড়ে। |
| এনাল ফিশার (Anal Fissure) | মলদ্বার ফেটে যাওয়া বা ক্ষত হওয়া। | মলত্যাগের সময় কাঁচ দিয়ে কাটার মতো তীব্র জ্বালা ও অসহ্য যন্ত্রণা। | শক্ত মলের গায়ে সামান্য রক্তের দাগ লেগে থাকে। |
| ফিস্টুলা / ভগন্দর (Fistula) | মলদ্বারের পাশে ছোট ছিদ্র হওয়া। | পুঁজ জমার সময় দপদপানি ব্যথা হয়। | নিয়মিত দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ, পানি ও রক্ত ক্ষরণ হয়। |
| কোলন বা রেকটাল ক্যানসার | হঠাৎ পায়খানার অভ্যাসের পরিবর্তন ও ওজন হ্রাস। | প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো ব্যথা নাও থাকতে পারে। | কালচে বা খয়েরি রঙের রক্ত ও আমাশয়ের মতো মিউকাস মলের সাথে মিশ্রিত থাকে। |
নারীদের পেলভিক অঞ্চলে চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্যের পেছনে অনেক সময় জরায়ুর বড় টিউমারের চাপও দায়ী থাকে। বিস্তারিত জানতে পড়ুন — জরায়ুতে টিউমার হলে কী লক্ষণ দেখা দেয়?
ঘরোয়া উপায়ে পাইলস নিরাময় ও নিয়ন্ত্রণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি
পাইলস যদি প্রথম বা দ্বিতীয় ধাপে থাকে, তবে কোনো বড় অস্ত্রোপচার ছাড়াই নিচের প্রমাণিত ঘরোয়া পদ্ধতিগুলো মেনে চললে রক্তনালীর ফোলা সম্পূর্ণ কমে গিয়ে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন:

পাইলসের ফোলা ও তীব্র জ্বালাপোড়া কমানোর সবচেয়ে কার্যকর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হলো সিটজ বাথ।
একটি বড় গামলা বা বাজারে পাওয়া যায় এমন প্লাস্টিকের সিটজ বাথ বেসিনে সহনশীল উষ্ণ গরম পানি নিন।
এতে কোমর পর্যন্ত পানিতে ডুবিয়ে দিনে ২ থেকে ৩ বার অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট বসে থাকুন।
গরম পানির তাপে মলদ্বারের রক্তনালীর স্ফীতি কমে, রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক হয় এবং স্পিঙ্কটার পেশির খিঁচুনি দূর হয়ে ব্যথা কমে যায়। (পানিতে কোনো স্যাভলন বা ক্ষতিকর অ্যান্টিসেপ্টিক মেশাবেন না, সাধারণ ফুটানো কুসুম গরম পানিই যথেষ্ট)।
২. খাদ্যতালিকায় দ্রবণীয় ফাইবারের বিপ্লব
মলকে নরম ও পিচ্ছিল করাই পাইলস সারানোর প্রধান চাবিকাঠি।
ইসবগুলের ভুষি: প্রতিদিন রাতে বা সকালে এক গ্লাস পানিতে ২ চামচ ইসবগুলের ভুষি ভিজিয়ে দেরি না করে সাথে সাথে খেয়ে ফেলুন। (ভুষি বেশিক্ষণ ভিজিয়ে রাখলে তা পেটের ভেতর গিয়ে পানি শোষণের ক্ষমতা হারায়)।
দেশীয় শাকসবজি ও ফল: প্রতিদিন খাদ্যতালিকায় রাখুন মিষ্টি কুমড়া, লাউ, পটল, পেঁপে, ঢ্যাঁড়শ এবং পালং শাক। পাকা বেল ও পাকা পেঁপে কোষ্ঠকাঠিন্যের সেরা প্রাকৃতিক মহৌষধ।
পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি: প্রতিদিন অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার (১০-১২ গ্লাস) পানি পান করতে হবে। শরীরে পানির ঘাটতি হলে কোলন মল থেকে পানি শুষে নিয়ে মলকে পাথরের মতো শক্ত করে ফেলে।
৩. মলত্যাগের অভ্যাসে বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন
কমোডে স্টুল ব্যবহার (Squat Posture): হাই কমোডে বসার সময় পায়ের নিচে ৬ থেকে ৯ ইঞ্চি উঁচু একটি ছোট টুল বা প্লাস্টিকের পায়া রাখুন। এর ফলে শরীর প্রাকৃতিক ৩৫ ডিগ্রি কোণে ঝুঁকে থাকে, যা রেকটামকে সোজা করে দেয় এবং কোনো চাপ বা কোঁথ দেওয়া ছাড়াই মল সহজে বেরিয়ে যায়।
টয়লেটে অতিরিক্ত সময় না কাটানো: কোনো অবস্থাতেই টয়লেটে খবরের কাগজ বা স্মার্টফোন নিয়ে যাবেন না। ৩ থেকে ৫ মিনিটের মধ্যে মলত্যাগ শেষ করার অভ্যাস করুন। কখনোই অতিরিক্ত চাপ বা কোঁথ দেবেন না।
৪. প্রাকৃতিক উপশমকারী উপাদান
বরফের শেক (Ice Pack): বহিঃস্থ পাইলসের রক্তনালী ফুলে অতিরিক্ত ব্যথা হলে একটি পাতলা পরিষ্কার কাপড়ে বরফ পেঁচিয়ে মলদ্বারে ১০-১৫ মিনিট চেপে ধরুন। এটি তাৎক্ষণিক ফোলা কমায়।
বিশুদ্ধ অ্যালোভেরা জেল বা খাঁটি নারকেল তেল: মলদ্বারের বাইরের ক্ষতে খাঁটি নারকেল তেল বা টাটকা অ্যালোভেরা জেল প্রলেপ হিসেবে দিলে জ্বালাপোড়া কমে এবং প্রদাহ উপশম হয়।
পাইলস হলে যেসব খাবার ও অভ্যাস সম্পূর্ণ বর্জনীয় (খাদ্য নিষেধাজ্ঞা)
ঘরোয়া চিকিৎসার মূল শর্ত হলো রোগের জ্বালানি বন্ধ করা। পাইলস থাকলে নিচের খাবারগুলো কঠোরভাবে এড়িয়ে চলতে হবে:
রেড মিট (গরু ও খাসির মাংস): এতে কোনো খাদ্যআঁশ থাকে না এবং এটি হজম হতে দীর্ঘ সময় নেয়, ফলে মারাত্মক কোষ্ঠকাঠিন্য তৈরি করে।
অতিরিক্ত ঝাল ও তেল-মসলাযুক্ত খাবার: অতিরিক্ত কাঁচামরিচ, শুকনামরিচ ও বিরিয়ানি-তেহারির মসলা হজম না হয়ে সরাসরি মলের মাধ্যমে বেরিয়ে মলদ্বারের ভেতরের ঘায়ে চরম জ্বালাপোড়া তৈরি করে।
প্রক্রিয়াজাত ও বেকারি খাবার: ময়দার তৈরি পরোটা, নানরুটি, পাউরুটি, পিৎজা ও ফাস্টফুড অন্ত্রের গতিশীলতা কমিয়ে দেয়।
চা, কফি ও কোমল পানীয়: অতিরিক্ত ক্যাফেইন শরীর থেকে পানি বের করে দিয়ে পানিশূন্যতা তৈরি করে, যার ফলে মল শক্ত হয়ে যায়।
ভারী ওজন তোলা: জিম করার সময় পেটে অতিরিক্ত চাপ দিয়ে খুব ভারী ওজন তোলা এড়িয়ে চলতে হবে।
পাইলস থেকে মারাত্মক রক্তশূন্যতা ও রক্তের জরুরি প্রয়োজন
অনেক পাইলস রোগী মনে করেন—"একটু রক্তই তো পড়ছে, কোনো ব্যথা তো নেই, এটা কোনো ব্যাপার না।" এই অসচেতনতা রোগীর জীবনকে চরম মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।

রোগী তখন আর দাঁড়াতে পারেন না, বুক ধড়ফড় করে এবং রক্তশূন্যতাজনিত হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকিতে পড়েন। এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় যেকোনো অপারেশনের আগে রোগীকে فوریভাবে ২ থেকে ৩ ব্যাগ তাজা রক্ত পরিসঞ্চালন করা ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না।
আপনার এক ব্যাগ রক্ত এমন রক্তশূন্যতায় ভোগা অসহায় রোগীর জীবন বাঁচাতে পারে। জানুন রক্তদানের শারীরিক ও মানসিক সুফল —রক্তদানের শারীরিক ও মানসিক উপকারিতা: বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ
রক্তদানের সঠিক মেডিকেল নিয়ম ও রক্ত দেওয়ার আগে কী খাওয়া উচিত তা জানতে পড়ুন — রক্ত দেওয়ার নিয়ম ও রক্ত দেওয়ার পূর্বে করণীয়
পাইলস বা অন্য যেকোনো জটিল অপারেশনে জরুরি রক্তের সন্ধানে দালালমুক্ত সহায়তা পেতে পড়ুন — অনলাইনে রক্তদাতা খোঁজার উপায় ও প্রতারণামুক্ত থাকার গাইড
আপনার এলাকায় যেকোনো গ্রুপের রক্তদাতা খুঁজে পেতে ভিজিট করুন — জরুরি রক্তদাতা খুঁজুন ও রিকোয়েস্ট পোস্ট করুন
মানবতার সেবায় রক্তদাতা হিসেবে নিজেকে যুক্ত রাখতে ফ্রি অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন — স্বেচ্ছায় রক্তদাতা হিসেবে নিবন্ধন করুন
কখন ঘরোয়া চিকিৎসা বাদ দিয়ে সার্জনের কাছে যেতে হবে? আধুনিক চিকিৎসা
ঘরোয়া চিকিৎসা পাইলসের প্রাথমিক ধাপে কার্যকর। তবে নিচের বিপদচিহ্নগুলো দেখা দিলে ঘরে বসে থাকা প্রাণঘাতী হতে পারে:
অবিলম্বে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার লক্ষণসমূহ:
যদি রক্তপাতের পরিমাণ অনেক বেশি হয় এবং কোনোভাবেই বন্ধ না হয়।
পাইলসের বলি বাইরে এসে আটকে গিয়ে তীব্র কালো বা বেগুনি বর্ণ ধারণ করে এবং অসহ্য ব্যথা শুরু হয় (Strangulated Hemorrhoid)।
মলের সাথে পচা রক্ত, মিউকাস বা দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ নির্গত হলে।
রোগীর বয়স ৪০ বছরের বেশি হলে এবং হঠাৎ পায়খানার নিয়মে স্থায়ী পরিবর্তন আসলে।
আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসাপদ্ধতি:
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে এখন আর আগের মতো মলদ্বার কেটে বড় ক্ষত করার দিন নেই:
ওষুধ ও মলম: চিকিৎসকের পরামর্শে ফ্লেভোনয়েড জাতীয় ওষুধ (যেমন Daflon), স্টুল সফটনার এবং অ্যানাস্থেটিক মলম প্রাথমিক পাইলস সম্পূর্ণ সারিয়ে তোলে।
রাবার ব্যান্ড লাইগেশন (RBL): দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের পাইলসে ওপিডি বা চেম্বারেই একটি ছোট রাবার রিং পরিয়ে রক্তনালীর রক্তপ্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কোনো কাটাছেঁড়া বা অজ্ঞান করা ছাড়াই কয়েক দিনের মধ্যে বলি খসে পড়ে যায়।
লেজার হেমোরয়েডোপ্লাস্টি (Laser Surgery - LHP): এটি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক পদ্ধতি। লেজার রশ্মির সাহায্যে রক্তনালীগুলোকে ভেতরেই সংকুচিত করে শুকিয়ে ফেলা হয়। এতে কোনো ক্ষত থাকে না, রক্তপাত হয় না এবং রোগী মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বাভাবিক কাজে ফিরতে পারেন।
লঙ্গো অপারেশন (Stapled Hemorrhoidopexy): বিশেষ মেশিনের সাহায্যে মলদ্বারের ভেতরের অতিরিক্ত ঝুলে পড়া অংশ কেটে পুনরায় সঠিক জায়গায় আটকে দেওয়া হয়।
নারীদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত রক্তক্ষরণ বা দীর্ঘমেয়াদী অ্যানিমিয়ার আরেকটি বড় উপসর্গ হলো পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম। বিস্তারিত পড়ুন — PCOS হলে কী কী সমস্যা হয়? সম্পূর্ণ গাইড
পাইলস নিয়ে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা বনাম আধুনিক বিজ্ঞান (Myth vs Reality)
| সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার (Myth) | চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রমাণিত সত্য (Fact) |
| ১. একবার পাইলস হলে অপারেশন ছাড়া আর কোনো পথ নেই। | সম্পূর্ণ ভুল। প্রাথমিক অবস্থায় খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, ফাইবার গ্রহণ ও সিটজ বাথের মাধ্যমে ৮০-৯০% পাইলস অপারেশন ছাড়াই ভালো হয়। |
| ২. গাছ-গাছড়ার পাতা বা এসিড লাগালে পাইলস মূলসহ চিরতরে ঝরে যায়। | এটি চরম সর্বনাশা হাতুড়েপনা। মলদ্বারে কোনো এসিড বা রাসায়নিক লাগালে মলদ্বারের মাংসপেশি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে পায়খানা আটকানোর ক্ষমতা চলে যায়। |
| ৩. পাইলস থেকেই পরবর্তীতে মলদ্বারের ক্যানসার তৈরি হয়। | পাইলস নিজে কখনো ক্যানসারে রূপান্তরিত হয় না। তবে কোলন ক্যানসারের রক্তপাতকে অনেকে ভুল করে সাধারণ পাইলস মনে করে অবহেলা করায় ক্যানসার শনাক্ত হতে দেরি হয়ে যায়। |
| ৪. পাইলস অপারেশন করার পর এটা আবার ফিরে আসে। | আধুনিক লেজার বা স্ট্যাপলার পদ্ধতিতে অভিজ্ঞ কোলোরেক্টাল সার্জন দ্বারা সঠিক নিয়মে অপারেশন করা হলে এবং রোগী ফাইবারযুক্ত খাবার খেলে পাইলস পুনরায় হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ। |
লজ্জা নয়, সঠিক সচেতনতাই পাইলসমুক্ত জীবনের নিশ্চয়তা
পাইলস কোনো গোপন পাপ বা লজ্জাজনক ব্যাধি নয়; এটি অনিয়মিত জীবনযাপন ও কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে মানবদেহের একটি সাধারণ যান্ত্রিক ত্রুটি। মলদ্বারে কোনো সমস্যা হলে লজ্জা পেয়ে লুকিয়ে রাখবেন না। কোনো হাতুড়ে বা কবিরাজের অবৈজ্ঞানিক এসিড চিকিৎসার ফাঁদে পা দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ জীবনকে পঙ্গু করবেন না।
প্রচুর পানি পান করুন, খাবারে শাকসবজি ও ফলমূলের পরিমাণ বাড়ান, টয়লেটে বসে স্মার্টফোন চালানো বন্ধ করুন এবং মল নরম রাখুন। প্রাথমিক অবস্থায় সচেতন হলে পাইলস ঘরোয়াভাবেই সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আর জটিলতা দেখা দিলে একজন অভিজ্ঞ কোলোরেক্টাল সার্জনের পরামর্শ নিয়ে আধুনিক, ব্যথাহীন চিকিৎসার মাধ্যমে ফিরে পান একটি স্বস্তিদায়ক, রোগমুক্ত ও কর্মচঞ্চল জীবন।
মন্তব্য (০)